প্রকাশিত:
১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫:৫৪
গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্ক (ট্যারিফ) আরোপের কথা তিনি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত।
ট্রাম্পের মতে, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং একই সঙ্গে ন্যাটো জোটের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, যারা এই পরিকল্পনার পক্ষে থাকবে না, তাদের শাস্তি দিতে শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যদি কোনো দেশ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমাদের সঙ্গে না থাকে, তাহলে আমি তাদের ওপর শুল্ক বসাতে পারি। আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, কারণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কিভাবে আগে শুল্ক ব্যবহার করে অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের দাম কমানোর পরিকল্পনায় সহযোগিতা করতে বাধ্য করেছিলেন।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক ব্যবহারের প্রস্তাব এই প্রথম দিলেও, কোনো কোনো দেশের ওপর এটি প্রয়োগ করা হবে বা কী আইনি ক্ষমতায় তা করা হবে— সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
গ্রিনল্যান্ডে তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে এটি ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে শুধু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড নয়, আরো কয়েকটি দেশ।
সিএনএনের এক জরিপ অনুযায়ী, এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। নেটোর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সদস্য যদি আরেক সদস্য দেশের ভূখণ্ড কিনে নেওয়া বা দখল করার কথা তোলে—এমন সম্ভাবনা সামনে এনে ট্রাম্পের ঘোষণাগুলো ইউরোপের কয়েক দশক পুরোনো এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা জোটকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য তার চাপ ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডে কোনো হামলা হলে কার্যত ন্যাটোর অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে বুধবার ডেনমার্ক ঘোষণা দেয়, তারা ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় সেখানে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
এরপর ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন নিশ্চিত করেছে— এই সপ্তাহেই তারা দ্বীপটিতে সামরিক সদস্য মোতায়েন করছে।
কানাডা ও ফ্রান্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ কনস্যুলেট খুলতে চায়। এই সপ্তাহের শুরুতে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স ল্যোক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ড্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চিত ও ফলহীন বৈঠকের জন্য হোয়াইট হাউস সফর করেন। রাসমুসেন বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তাদের ‘খোলামেলা কিন্তু গঠনমূলক আলোচনা’ হয়েছে, তবে তাদের ‘দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।’
তবুও রাসমুসেন জানান, ‘পক্ষগুলো একটি উচ্চ পর্যায়ের কার্যকরী দল গঠনে সম্মত হয়েছে, যাতে একটি অভিন্ন পথ খুঁজে পাওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখা যায়।’ এই দলটি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বৈঠকে বসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা একমত হয়েছি যে উচ্চ পর্যায়ে বসে দেখার চেষ্টা করা যৌক্তিক—রাষ্ট্রপতির উদ্বেগগুলো কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া যায়। আবার একই সঙ্গে ডেনমার্ক রাজ্যের লাল রেখাগুলোও কীভাবে সম্মান করা যায়। এ কাজটাই আমরা শুরু করব।’
ট্রাম্পের মন্তব্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডেনমার্কের সামরিক সম্পর্ক অপরিবর্তিত রয়েছে বলে শুক্রবার সিএনএনকে জানান গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের যৌথ আর্কটিক কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল সোরেন অ্যান্ডারসেন। অ্যান্ডারসেন বলেন, কমান্ডটি দ্বীপটিতে সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তিনি যোগ করেন, ‘আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’ মিশনের লক্ষ্য রাশিয়াকে নিরুৎসাহিত করা এবং নেটোর উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সুরক্ষা করা।
তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, ‘এই মুহূর্তে গ্রিনল্যান্ডের প্রতি কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি নেই।’ এদিকে, দেশভিত্তিক ব্যাপক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা শিগগিরই ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সীমিত হতে পারে। কারণ, একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট শিগগিরই রায় দিতে যাচ্ছে। বিচারপতিরা যেভাবেই রায় দিন না কেন, ট্রাম্পের হাতে শুল্ক বাড়ানোর নানা উপায় থাকবে। তবে নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে তিনি যেভাবে শুল্ক আরোপ করেছেন, তার বিকল্প পথগুলো তুলনামূলকভাবে আরো সীমিত।
মন্তব্য করুন: