প্রকাশিত:
১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৪৫
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রভাবে গত চার মাস ধরে কমছে দেশের পণ্য রপ্তানি। বাড়তি শুল্কারোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেড়ে গেছে তৈরি পোশাকের দাম। ফলে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশটির বড় বড় ক্রেতারা অর্ডার (ক্রয়াদেশ) কমিয়ে দিয়েছেন। ইউরোপের বাজারেও মন্দাবস্থা বিরাজ করছে।
রপ্তানিখাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করতে চান। এ অবস্থায় ফের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের রপ্তানি খাত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, পণ্যের মানোন্নয়নে নজর দেওয়া, নতুন বাজারের অনুসন্ধান, সহজশর্ত ও স্বল্পসুদের ঋণ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে রপ্তানি খাত।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) পণ্য রপ্তানির এ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের পণ্য রপ্তানি চার মাস ধরে কমছে। গত নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য। এ রপ্তানি গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছিল ৪১২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য। টানা চার মাস রপ্তানি কমলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।
শীর্ষ পাঁচ খাতের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ছাড়া বাকিগুলোর রপ্তানি নভেম্বর মাসে কমেছে। খাতগুলো হলো-তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইল। এ ছাড়া চামড়াবিহীন জুতা, হিমায়িত খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানিও কমেছে। দেশের তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। গত মাসে রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য।
এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম। চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানি খাত পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি গত মাসে সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের পণ্য। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৩৫ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
উদ্যোক্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার কারণেই রপ্তানি আয় কমছে। আগামী মাসগুলোতেও এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তারা। রেমিটেন্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলেও রপ্তানি আয় কমছেই। আর এটাই অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। শুধু রেমিটেন্স দিয়ে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
গত এপ্রিল থেকে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। ৩১ জুলাই বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক এড়াতে জুলাই মাসে অনেক পণ্য জাহাজীকরণ হয়েছে। স্থগিত থাকা অনেক পণ্যও রপ্তানি হয়। সে কারণে জুলাই মাসে রপ্তানি অনেক বেড়েছিল বলে মনে করেন পোশাক রপ্তানিকারকরা।
৭ আগস্ট থেকে ট্রাম্পের ঘোষিত শুল্ক কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশে। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক ঘোষণা করেন। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ। প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় দুশ্চিন্তামুক্ত হন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন এর সুফল বাংলাদেশ পাবে। তার লক্ষণও দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উল্টো চিত্র। রপ্তানি না বেড়ে উল্টো কমছে। এ প্রসঙ্গে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জনকণ্ঠকে বলেন, টানা চার মাস রপ্তানি আয় কমায় আমরা উদ্বিগ্ন, বিচলিত। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ধাক্কার প্রভাবে আমাদের পোশাক রপ্তানি কমছেই, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, কারণ বেশিরভাগ ক্রেতাই নতুন করে কোনো অর্ডার দিচ্ছে না। তারা এখন অতিরিক্ত ২০ শতাংশ রেসিপ্রোক্যাল শুল্কের (পাল্টা শুল্ক) একটি অংশ বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রপ্তানিকারকদের পক্ষে এই অতিরিক্ত চাপ বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ তারা ইতোমধ্যেই প্রাথমিক শুল্ক সমন্বয় এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবসহ বিভিন্ন ধরনের চাপে রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং অন্যান্য বাজারেও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। কারণ চীনা ও ভারতীয় প্রস্তুতকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এইসব বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
আমরা আশঙ্কা করছি, এই ধীরগতি আগামী দুই থেকে তিন মাস অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলে, আমাদের রপ্তানি আবারও পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করছি। এ সময়টায় রপ্তানিকারকদের ধৈর্য্যসহকারে ক্রেতাদের যেকোনো ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হবে।
অর্থনীতির গবেষক বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির প্রধান দুই সূচক রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় সংকট কেটে যাওয়ার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু রপ্তানি আয় কমায় সেটা হোঁচট খেয়েছে। রপ্তানি আয় যাতে না কমে, সেদিকে এখন সরকার ও রপ্তানিকারকদের নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এভাবে রপ্তানি আয় কমলে রিজার্ভেও কিন্তু টান পড়বে। শুধু রেমিটেন্স দিয়ে রিজার্ভ পতন ঠেকানো যাবে না।
গত চার মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেগেটিভ, যা মূলত পোশাক খাতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, নতুন বাজার সম্প্রসারণে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জের কারণে হচ্ছে। তবে সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি বহুমুখী করা, পণ্যের মান উন্নয়ন, ব্যবসা সহজীকরণ এবং অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশ ও নীতিসহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উপায় খুঁজছে।
এজন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণ বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকার বাইরে নতুন বাজার খুঁজে বের করা, যেমন-আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি বাড়াতে হবে। পণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদন খরচ কমানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খল সহজ করতে হবে। রপ্তানি প্রণোদনা, আর্থিক সহায়তা, ব্যবসাবন্ধব পরিবেশ তৈরি এবং অন্যান্য নীতিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরবে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। সম্প্রতি রপ্তানিখাতের চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত এক সেমিনারে সরকারের নীতি সহায়তার ঘাটতি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিকূল নীতি, বন্দর-কাস্টমসে সেবার দীর্ঘসূত্রতা, বৈদেশিক মুদ্রানীতি, ব্যাংক ঋণে সুদের উচ্চহার ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) না করার সমালোচনা করেন রপ্তানিকারক উদ্যোক্তারা।
এসবের জবাবে ওই অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, গত ১৬ বছরের দুর্বৃত্তায়নে অর্থনীতিতে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তাতে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ হয়েছে। এত খেলাপি ঋণ পৃথিবীর বহু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও নেই। কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে দুর্বৃত্তায়িত করা হয়েছিল। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জায়গা ছিল না। এগুলো অর্থনীতিতে মন্দাবস্থা তৈরি করেছিল। তিনি বলেন, রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কাঁচামাল নেই, সেবার ব্যয় বেশি, কাস্টমসে সমস্যা, যদিও বন্দরে সমস্যা নেই। পণ্য ছাড় করার সময় ১১ দিনের জায়গায় তিন দিনে নামিয়ে আনতে হবে। ব্যবসা সহজ করা ও উৎপাদন ব্যয় কমানো দরকার। এ বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন। দোষারোপ না করে সরকার ও বেসরকারি খাতকে এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, এসএমই খাত সরকারের তেমন সহযোগিতা পায় না। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে এ খাতে বড় ধরনের সহযোগিতা দরকার। দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
এ ছাড়া রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনতে প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজার অনুসন্ধান এবং ব্র্যান্ডিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। রপ্তানি বাড়াতে বিদেশে বিভিন্ন বাংলাদেশি দূতাবাসে থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কমার্শিয়াল উইংগুলোকে একীভূত করে একটি স্বতন্ত্র ট্রেড প্রমোশন এজেন্সি গঠনের প্রস্তাব করেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ। তিনি বলেন, দেশের বাইরে বিভিন্ন দূতাবাসে কমার্শিয়াল উইং আছে। এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ আছে। রপ্তানি বাড়াতে হলে কমার্শিয়াল উইংগুলোকে কাজ করতে হবে।
রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জনকণ্ঠকে বলেন, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক কার্যকরের কারণে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাকের দাম ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে। সে জন্য মার্কিন বাজারে পণ্যের চাহিদা কিছুটা কমে গেছে। সে জন্য বাজারটিতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে।
এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতার কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছেন।
মন্তব্য করুন: