প্রকাশিত:
৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৪৬
ঝুঁকিপূর্ণ ডাউকি ফল্টের কারণে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে সুনামগঞ্জ। বিশেষ করে হাওর, জলাশয় ও পুকুর ভরাট করে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণসহ একাধিক কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে এই ভাটি অঞ্চল। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পেও ধসে পড়তে পাড়ে জেলার শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জল-জোৎসনার শহর কিংবা সবুজ শ্যামলে ঘেরা সৌন্দর্যময় এক জেলা সুনামগঞ্জ। যেখানে ৬ মাস শুকনা থাকলেও বাকি ৬ মাস চারদিকে থাকে অথৈ জল। যাকে ঘিরে এই জেলায় আউল বাউলসহ অনেক সাধক গেয়েছেন নানা রকমের গ্রাম বাংলার গান। যা পরিচিতি পেয়েছে বিশ্ব দরবরে। প্রতিবছর এই জেলার মানুষ পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ফসল হারানো কিংবা বন্যা আতঙ্কে সময় পার করলেও বর্তমানে জেলাটিতে বিরাজ করছে ভূমিকম্প আতঙ্ক।
মূলত ২২.১৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সুনামগঞ্জ পৌর শহর। যেখান থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ডাউকি ফল্টের অবস্থান। সক্রিয় এই ফন্টলাইনের কারণে বিভিন্ন সময় কেঁপে ওঠে সুনামগঞ্জসহ সিলেট অঞ্চল। ট্যাকটনিক কিনারে এই প্লেটের অবস্থান হওয়ায় ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্য এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সিলেট-সুনামগঞ্জ রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে। ফলে ভূমিকম্প বলয় হিসেবে ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জ শহরটির নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন ভবন চিহ্নিত করে পৌর কর্তৃপক্ষ।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ডিএস রোড এলাকায় অবস্থিত পৌর বিপনি মার্কেট। যেখানে প্রায় বিভিন্ন রকমের অর্ধশতাধিকের ওপরে দোকান রয়েছে। তবে এক দশক আগেই এই মার্কেটকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তিনতলায় একের পর এক নতুন স্থাপনা গড়ে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিদের দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। আর এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ঝুঁকি। ভূমিকম্পে এই ভবনটি ধসে পড়লে প্রাণহানি ঘটবে বহু মানুষের।
শুধু পৌর বিপণী মার্কেট নয়, সুনামগঞ্জ পৌর শহরে সময়ের ব্যবধানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে হাজারেরও বেশি বহুতল ভবন। যার অধিকাংশ ওই বিল্ডিং কোড, সেটব্যাক কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তৈরি করা হয়েছে। এমনকি এসব বহুতল ভবন নির্মাণের সময় পৌর কর্তৃপক্ষের তদারকি না থাকায় তাদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি পৌর শহরের ২, ৩, ৪ ও ৫নং ওয়ার্ডকে ভূমিকম্পের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করে দুর্যোগে ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম।
চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ ও সিলেট এলাকায় মৃদু ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। যার উৎপত্তিস্থল ছিল সুনামগঞ্জের ছাতক। সর্বশেষ ২১ নভেম্বর সারা দেশে পাঁচ মাত্রার বেশি ভূ-কম্পন এবং ২৭ নভেম্বর সিলেট অঞ্চলে ভূ-কম্পন অনুভূত হলে সারাদেশের মতো আতঙ্কে পড়ে সুনামগঞ্জের মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, সুনামগঞ্জ শহরে যেসব বহুতল ভবন হচ্ছে তা বিল্ডিং কোড মেনে হচ্ছে না। তাছাড়া এই জেলায় একটু বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে শতাধিকের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে পড়বে।
পৌর শহরের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট শাহিন বলেন, বাংলাদেশের এখন আলোচিত বিষয় ভূমিকম্প। এর ফলে সারাদেশে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল এবং সুনামগঞ্জ জেলায়। হাওরবেষ্টিত এই জেলা মেঘালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় রেড জোনে রয়েছে। এত এখন সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
পৌর শহরের বাসিন্দা সামিয়ান রহমান বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণে অনুমোদন ঠিকই দিচ্ছে, কিন্তু তার তদারকি তারা করছে না। আবার অনেকেই পৌর শহরে বিলিং কোড না মেনে ভবন তৈরি করেছেন যা পৌরবাসীর জন্য বড় বিপদের সংকেত দিচ্ছে।
এদিকে পরিবেশ বিশ্লেষক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, সুনামগঞ্জ ভূমিকম্পের ডেঞ্জার জোনে আছে। যেকোনো সময় ভূমিকম্প হলে শহরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে পড়ে হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। যার দায় সরকারকে নিতে হবে।
তবে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কয়েস আহমদ তাদের গাফিলতির কথা স্বীকার করে বলেন, জেলায় শতাধিকের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। সেগুলো চিহ্নিত করে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির ক্ষেত্রে গাইডলাইন ফলো করতে পৌর কর্তৃপক্ষে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
১৭৯৭ সালে সুনামগঞ্জসহ সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনায় সুনামগঞ্জের অনন্ত ২৮৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।
মন্তব্য করুন: