প্রকাশিত:
১০ নভেম্বর ২০২৫, ১৪:২৮
ইসরায়েলি সেনারা গাজায় একপ্রকার নিয়ন্ত্রণহীন যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নৈতিকতার ভাঙনের চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে বেসামরিক মানুষদের হত্যা করা হয়েছে অফিসারদের খেয়ালখুশিমতো। এমন অভিযোগ উঠে এসেছে ব্রিটিশ টেলিভিশন আইটিভির প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্রেকিং র্যাঙ্কস: ইনসাইড ইসরায়েলস ওয়ার’-এ।
ডকুমেন্টারিটি সোমবার সন্ধ্যায় যুক্তরাজ্যে প্রচারিত হওয়ার কথা। এতে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) বেশ কিছু সেনা নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
কেউ পরিচয় গোপন রেখে, কেউবা প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। সবাই একইভাবে জানিয়েছেন যে, বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি আইডিএফের আচরণ ছিল বর্বর।
ড্যানিয়েল নামে একজন ট্যাঙ্ক ইউনিট কমান্ডার বলেছেন, ‘যদি তুমি সীমাহীনভাবে গুলি চালাতে চাও, সেটা পারো। কেউ তোমাকে আটকাবে না।
অন্য এক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইয়োতাম ভিল্ক বলেছেন, আইডিএফের প্রাথমিক প্রশিক্ষণে সেনাদের শেখানো হয় ‘মিন্স, ইনটেন্ট অ্যান্ড অ্যাবিলিটি’। অর্থাৎ, শত্রুর হাতে অস্ত্র (মিন্স), ক্ষতির ইচ্ছা (ইনটেন্ট), এবং তা করার সামর্থ্য (এবিলিটি) থাকতে হবে।
কিন্তু, ভিল্কের ভাষায়, ‘গাজায় এসব কিছুর কোনো মানে নেই। কেউ যদি নিষিদ্ধ এলাকায় হাঁটে, তাহলেই সন্দেহভাজন।
বয়স যদি ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হয়, তাহলেই সম্ভাব্য শত্রু।
আরেক সৈনিক, যিনি ‘এলি নামে পরিচিত তিনি বলেন, ‘জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়ম বা ফায়ারিং প্রটোকল দিয়ে হয় না। মাঠের কমান্ডারের বিবেকই শেষ কথা। এসব পরিস্থিতিতে শত্রু বা সন্ত্রাসী কাকে বলা হবে তা সম্পূর্ণ মনগড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, কেউ খুব দ্রুত হাঁটলে সে সন্দেহভাজন।
কেউ ধীরে হাঁটলে, তাও সন্দেহজনক। মনে করা হয় কিছু একটা করছে। তিনজন একসাথে হাঁটলে এবং একজন পিছিয়ে থাকলে, বলা হয় তারা সামরিক ‘টু-টু-ওয়ান ফরমেশন’-এ আছে।
এলি একটি ঘটনার কথা বলেন, যেখানে এক সিনিয়র অফিসার নির্দেশ দেন একটি ট্যাঙ্ক থেকে গোলা ছুড়ে এমন একটি ভবন ধ্বংস করতে, যা বেসামরিকদের জন্য নিরাপদ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
তিনি বলেন, একজন মানুষ ছাদে কাপড় শুকাচ্ছিলেন। অফিসার বললেন, তিনি হয়তো ‘স্পটার’, অর্থাৎ শত্রুর নজরদার। অথচ লোকটা শুধু কাপড় শুকাচ্ছিলেন। কোনো দূরবীন বা অস্ত্র তার হাতে ছিল না। নিকটতম সামরিক ইউনিট ছিল ৬০০–৭০০ মিটার দূরে। তারপরও ট্যাঙ্ক থেকে গোলা ছোড়া হয়। ভবনের অর্ধেক ধসে পড়ে, অনেক মানুষ মারা যায় ও আহত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় নিহতদের মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশই বেসামরিক, যা আধুনিক যুদ্ধে নজিরবিহীন একটি সংখ্যা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
আইডিএফ এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছে, ‘আইডিএফ আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং আইনগত ও নৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকেই কাজ করছে, যদিও হামাস ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় লুকিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে, যা অপারেশনকে জটিল করেছে।’
তবে প্রামাণ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া কিছু সেনা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি ও বিদেশির নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতাদের ভাষায় তারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। যেখানে বলা হচ্ছিল, ‘প্রত্যেক ফিলিস্তিনি এখন তাদের প্রধান টার্গেট।’
প্রামাণ্যচিত্রে আরো প্রকাশ পেয়েছে যে, ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে এই ধরণের প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন সেনাবাহিনীর চরমপন্থী ধর্মীয় নেতা রাব্বি আভ্রাহাম জারবিভ।
মেজর নেতা কাসপিন বলেন, ‘একবার রাব্বি আমার পাশে বসে আধাঘণ্টা ধরে বোঝালেন যে আমাদেরও ৭ অক্টোবরের মতো হতে হবে। আমাদের প্রতিশোধ নিতে হবে সবার ওপর, এমনকি বেসামরিকদের ওপরও। যেন আমরা কোনো পার্থক্য না করি। এটাই একমাত্র পথ ‘
চরমপন্থী ধর্মীয় নেতা রাব্বি আভ্রাহাম জারবিভ, যিনি গাজায় ৫০০ দিনেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন, প্রামাণ্যচিত্রে বলেন, ‘ওখানে সবকিছুই এক বিশাল সন্ত্রাসী অবকাঠামো।’
জারবিভ শুধু ফিলিস্তিনি পাড়াগুলো ধ্বংসের ধর্মীয় বৈধতা প্রদানই করেননি, বরং নিজেই সামরিক বুলডোজার চালিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে তিনিই এই কৌশলটির উদ্ভাবক, যা পরে পুরো আইডিএফ গ্রহণ করে। তিনি বলেন, ‘আইডিএফ লাখ লাখ শেকেল বিনিয়োগ করছে গাজা ধ্বংসের জন্য। এর মাধ্যমে আমরা পুরো সেনাবাহিনীর আচরণই বদলে দিয়েছি।’
মানব ঢাল ব্যবহারের স্বীকারোক্তি‘ব্রেকিং র্যাঙ্কস’–এ সাক্ষাৎকার দেওয়া সৈন্যরা নিশ্চিত করেছেন যে, গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহারের প্রচলিত অভিযোগ সত্যি।
ট্যাঙ্ক কমান্ডার ড্যানিয়েল বলেন, মানব ঢালকে টানেলের ভেতরে পাঠানো হয়। সে হাঁটতে হাঁটতে পুরো টানেলের মানচিত্র তৈরি করে ফেলে। তার জ্যাকেটে থাকা আইফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জিপিএস তথ্য পাঠাতে থাকে। কমান্ডাররা দেখলেন এটা কাজ করছে, আর এরপর এই প্রক্রিয়া আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় প্রতিটি কম্পানির নিজস্ব ‘মানবঢাল’ ছিল।
তবে আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইডিএফ কোনোভাবেই বেসামরিক নাগরিকদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার বা জোরপূর্বক সামরিক অভিযানে যুক্ত করার অনুমতি দেয় না। এ বিষয়ে সেনাদের নিয়মিতভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তারা আরও জানায়, অভিযোগ পাওয়া গেলে তা বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা হয়। বেশ কয়েকটি ঘটনায় সামরিক পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে, যা এখনো চলমান।
প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতারা কথা বলেছেন ‘স্যাম’ নামের এক কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে, যিনি গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে কাজ করতেন। তিনি বলেছেন, তিনি নিজ চোখে দেখেছেন আইডিএফ নিরস্ত্র বেসামরিকদের হত্যা করছে।
একটি ঘটনার বর্ণনায় স্যাম বলেন, দুই তরুণ ছুটে যাচ্ছিল সাহায্য নিতে। হঠাৎ দেখি দুই সৈন্য দৌড়ে গেল, হাঁটু গেড়ে বসলো, দুইবার গুলি চালালো, আর সঙ্গে সঙ্গে দুইজনের মাথা পেছনে ছিটকে পড়ে গেল। অন্য এক ঘটনায় সাহায্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে একটি আইডিএফ ট্যাঙ্ক একটি সাধারণ গাড়ি ধ্বংস করে দেয়। গাড়িটায় চারজন সাধারণ মানুষ বসে ছিল, তারা পুরোপুরি নিরস্ত্র।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিএইচএফ-এর সাহায্যকেন্দ্রের আশেপাশে অন্তত ৯৪৪ জন ফিলিস্তিনি বেসামরিক নিহত হয়েছেন সাহায্য নিতে গিয়ে। তবে জিএইচএফ ও আইডিএফ উভয়েই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, বলেছে তারা কখনো সাহায্যপ্রার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করেনি এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হামাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে।
আইডিএফ জানায়, বেসামরিক নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য শাস্তি বা আইনি জবাবদিহিতা হয়নি।
প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, গাজা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বহু ইসরায়েলি সৈন্যের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে।
ড্যানিয়েল বলেন, আমি অনুভব করি, তারা আমার ইসরায়েলি হিসেবে গর্বটা ধ্বংস করে দিয়েছে। আইডিএফ অফিসার হিসেবে গর্বটাও। এখন যা বাকি আছে, তা শুধু লজ্জা।
মন্তব্য করুন: