প্রকাশিত:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:৩৮
বরিশাল মানেই নদী। সেই নদীর বুক জুড়ে ছুটে চলা প্যাডেল স্টিমার একসময় ছিল দক্ষিণবঙ্গের প্রাণশক্তি। শুধু পরিবহন নয়, স্টিমার হয়ে উঠেছিল নদীমাতৃক বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই জলযাত্রা একসময় ভাসমান প্রাসাদের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ ছিল।
কিন্তু ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেমে যায় সেই সুর। কদমতলীর ঘাটে নিঃশ্বাসহীন পড়ে থাকে পিএস অস্ট্রিচ, মাহসুদ, লেপচা ও টার্ন। যেন নদীর বুকেই তাদের সমাধি। তবে শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, আবার চালু হচ্ছে স্টিমারসেবা।
আগামী অক্টোবর থেকেই ঢাকা ও বরিশাল রুটে নামবে স্টিমা্র। প্রথম ধাপে পিএস অস্ট্রিচ ও পিএস মাহসুদ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আর লেপচা ও টার্নকে নদীর বুকেই ভাসমান জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হবে। ঘোষণার পর থেকেই নগরের বাতাসে যেন ফিরে এসেছে পুরোনো সেই সুর, ছলাৎ ছলাৎ তরঙ্গ, হুইসেলের গর্জন আর যাত্রার উত্তেজনা।
স্টিমার ঘাট মানেই ছিল সকাল-বিকেলের ভিড়। ধোঁয়া ভেসে আসা লেপচা, টার্ন আর হুইসেলের দীর্ঘশ্বাস যেন দক্ষিণ বাংলার জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছিল। বরিশালের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে নদী আর স্টিমারকে আলাদা করা যায় না। কবি জীবনানন্দ দাশ যখন ‘রূপসী বাংলা’ লিখেছেন, তখন তার কবিতার ভেতরে লুকিয়ে ছিলো নদীযাত্রার বেদনা। কবি হেনরী স্বপন বলেন, স্টিমারের যাত্রা মানেই আবেগ।
হুইসেলের শব্দ শুনে মানুষ ঘাটে ছুটে আসত। আবার চালু হচ্ছে এই খবর যেন বুকের ভেতর ঢেউ তোলে। শামসুর রাহমান থেকে হুমায়ূন আহমেদের লেখায় বারবার ফিরে এসেছে এই নদীযাত্রার স্মৃতি। এই নদী আর নৌযাত্রা কেবল ভ্রমণের গল্প নয়, বরং স্মৃতির ভাঁজে এক অন্তহীন যাত্রা।
স্টিমারের হুইসেল তাই ছিল না শুধু যান্ত্রিক শব্দ, ছিল বিদায়ের বেদনা আর প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষার সুর। ঘাটে দাঁড়ানো কারোর চোখ ভেজা, কারোর মনে আশার ঢেউ। অথচ আজ সেই স্টিমার ঘাট আর নেই। যেখানে একসময় ভিড় জমত, সেখানে চলছে উন্নয়ন প্রকল্প। তাই আগামী মাসে স্টিমারসেবা পুনরায় চালুর ঘোষণায় অনেকেই এখনো সন্দিহান।
১৮৮৪ সালে বাংলার নদীপথে নামানো হয় কয়লাচালিত স্টিমার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে খুলনা পর্যন্ত যাতায়াত করত এসব জাহাজ। পথে চাঁদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, মোরেলগঞ্জসহ নানা ঘাটে থামত। তখন ফ্লোটিলা কোম্পানির বহরে ছিল ১৪টি স্টিমার। পরে যুক্ত হয় অস্ট্রিচ, মাহসুদ, লেপচা, টার্নসহ আরো কয়েকটি।
কিন্তু পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, সড়ক যোগাযোগের উন্নতি, লঞ্চমালিকদের দাপট আর জ্বালানি খরচ মিলিয়ে ক্রমেই শ্বাসরোধ হয় স্টিমারের। ২০১৯ থেকে সীমিত চলাচল এবং ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শেষবারের মতো ঢাকা ছাড়ে এমভি মধুমতি ও এমভি বাঙ্গালি।
বরিশাল যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক দেওয়ান আবদুর রশিদ বলেন, ‘এই স্টিমারগুলো কেবল জাহাজ নয়, সভ্যতার চিহ্ন। এগুলোকে ভাসমান জাদুঘরে রূপ দেওয়া হোক, নাহলে ইতিহাস হারিয়ে যাবে নদীর তলায়।’
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় স্টিমার ফেরানোর ঘোষণা দিলেও বিআইডব্লিউটিসির স্থানীয় কর্মকর্তারা এখনো নিশ্চিত নন। তাদের আশঙ্কা, পদ্মা সেতুর কারণে লঞ্চ ব্যবসা যেখানে টিকতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে স্টিমার কি টিকবে? তবে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান জানিয়েছেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ওয়েস্টার্ন মেরিনে সংস্কার শেষে পিএস অস্ট্রিচ ও পিএস মাহসুদকে নদীতে নামানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
স্টিমারের হুইসেল একসময় বিদায়ের সুর ছিল, আবার কারোর প্রিয়জনের ফেরার প্রতীক্ষা। বহু বছর পর সেই হুইসেলের ডাক আবার জাগিয়ে তুলবে দক্ষিণ বাংলার স্মৃতি, আবেগের ঢেউ।
মন্তব্য করুন: