প্রকাশিত:
১৭ আগষ্ট ২০২৫, ১৩:৫৪
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘভাঙা বৃষ্টির প্রভাবে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভুমিধসে মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়েছে। এরমধ্যে অন্তত ৩২৮ জন শুধু খাইবার পাখতুনখোয়ায় বাসিন্দা।
এছাড়া ভারতের উত্তরাখণ্ডেও বেড়েছে মেঘভাঙার প্রবণতা। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘভাঙা বৃষ্টি আসলে কী এবং কেন হয়?
মেঘভাঙা বৃষ্টি কী
কোনো ছোট এলাকায় (এক থেকে দশ কিলোমিটার বিস্তৃত) এক ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হলে সেটি ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘভাঙা বলে ধরা হয়।
এই ধরনের বৃষ্টির তীব্রতা স্বাভাবিক বৃষ্টির চেয়ে অনেক বেশি। ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও তাই বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় মেঘভাঙা ঘটলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়, প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে।
কীভাবে হয় মেঘভাঙা
আবহাওয়াবিদদের মতে, উষ্ণ বায়ু ঠান্ডা বায়ুর সংস্পর্শে এলে মেঘ ঘনীভূত হয়। গরম বাতাস ওপরে উঠতে থাকায় মেঘে জমে থাকা জলকণা বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারে না। বরং সেই কণাগুলোও ওপরে টেনে নেয় উষ্ণ বাতাস।
পাহাড়ি ঢাল বেয়ে এই বায়ুপ্রবাহ ওপরে উঠতে উঠতে শীতল হয়ে ঘনীভূত হয়। একসময় মেঘ আর জল ধরে রাখতে না পেরে হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে নামিয়ে আনে বিপুল পরিমাণ পানি।
এই প্রক্রিয়াকেই ‘অরোগ্রাফিক লিফ্ট’ বলা হয়। আক্ষরিক অর্থে কোনো বিস্ফোরণ না হলেও মনে হয় যেন আকাশ ফেটে পানি ঝরছে।
পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুঁকি বেশি
সমতলেও মেঘভাঙা বৃষ্টি ঘটতে পারে। তবে অরোগ্রাফিক লিফ্টের কারণে পার্বত্য অঞ্চলে এর সম্ভাবনা বেশি। পানি নামার সময় পাহাড়ি পাথর, কাদা আর ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বাড়ায়।
আশপাশে নদী-নালা বা লেক থাকলে ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যায়। পাকিস্তান ছাড়াও এর আগে ভারতের উত্তরাখণ্ড, সিকিম, লাদাখসহ হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে এর আগে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের হিমালয় এলাকায় চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে মেঘভাঙা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন
এক থেকে দশ কিলোমিটারের মধ্যে হঠাৎ আবহাওয়া বদলে যাওয়ার কারণে মেঘভাঙা বৃষ্টির আগাম পূর্বাভাস পাওয়া কঠিন। রাডারের সাহায্যে কোনো এলাকায় অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আভাস পাওয়া গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় মেঘভাঙা হবে তা বলা প্রায় অসম্ভব।
ডপলার রাডার এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে হিমালয় সংলগ্ন প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত রাডার নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন রাডার নেটওয়ার্ক এবং অতিউচ্চ-রেজোলিউশনের পূর্বাভাস মডেল এই চ্যালেঞ্জ কিছুটা কাটাতে পারে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, হিমালয়ের অন্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তরাখণ্ডে প্রতি ইউনিট এলাকায় মেঘভাঙা বেশি ঘটে। এর নেপথ্যে প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অবস্থা ছাড়াও আছে মানবসৃষ্ট পরিবর্তন।
অতিরিক্ত সড়ক, বাঁধ, ভবন নির্মাণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। বনভূমি উজাড় ও ভূমি-ব্যবহারের পরিবর্তনে মাটি পানি শোষণের ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত বন্যা ও ভূমিধসে রূপ নেয়।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বায়ুর ধরন বদলেছে। হিমালয়ের সংকীর্ণ উপত্যকায় আর্দ্রতা জমে থেকে বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়াচ্ছে।
মন্তব্য করুন: