প্রকাশিত:
৫ আগষ্ট ২০২৫, ১৩:৪২
মানবসমাজে মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, বিবাদ ও দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। পরিবার থেকে রাষ্ট্র, পর্যন্ত, প্রতিবেশী থেকে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে যে কোনো ইস্যুতে বিরোধ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিরোধের মুহূর্তে আমরা কী করি?
ইসলামী নীতি এখানে নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে না; বরং দ্বন্দ্ব নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণকে ঈমানদারের দায়িত্ব বলে ঘোষণা করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি মুমিনদের দুই দল পরস্পর যুদ্ধ করে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করো..." (সুরা হুজরাত, আয়াত : ৯)
এই আয়াত মুমিনদের সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য নিদর্শন। এখানে আল্লাহ তায়ালা শুধু বিরোধ এড়িয়ে যাওয়ার কথা বলেননি; বরং মীমাংসার জন্য এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলাম শুধু আত্মসংযম শেখায় না, বরং সংঘাতের আগুন নিভিয়ে দেওয়ার পথও দেখায়।
রাসুল (সা.)-এর জীবন্ত দৃষ্টান্ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন দ্বন্দ্ব নিরসনের প্রতীক। মক্কার কাবাঘরের পুনর্নির্মাণের সময় হাজরে আসওয়াদ স্থাপনা নিয়ে কুরাইশ গোত্রগুলোর মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
তখন মহানবী (সা.) কৌশলী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে সকল পক্ষকে সন্তুষ্ট করেন। এক চাদরে পাথর রেখে সব গোত্রপ্রধানকে ধরতে দেন, আর নিজ হাতে পাথর স্থাপন করেন।
তিনি বলেন: ‘তোমরা পরস্পরের মধ্যে হিংসা করো না, ঘৃণা করো না, এবং সম্পর্কচ্ছেদ করো না। আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই হও ‘ (মুসলিম, হাদীস: ২৫৬৪)
উস্কানিদাতাদের ভূমিকা ও ইসলামের সতর্কতা আজকের সমাজে অনেকেই বিরোধ দেখলেই তা আরও উস্কে দেন।
সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, একপক্ষীয় বিচার ইত্যাদির মাধ্যমে পরিস্থিতি জটিল হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুমিন কখনো অন্য মুমিনের অপকার করতে পারে না, বরং তার ভাইয়ের প্রতি সে দয়াপরায়ণ হয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪০)
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমরা অনেক সময় নিজেদের কথাবার্তায় আগুন ছড়াই, উল্টো শান্তির উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টাকে দুর্বলতা মনে করি। অথচ প্রকৃত শক্তি হলো কারো ভুল মাফ করে দেওয়া ও শান্তির দিকে হাত বাড়ানো।
দ্বন্দ্ব নিরসনে মুসলিম সমাজের করণীয়
১. ন্যায়নিষ্ঠ শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা: উভয় পক্ষের কথা শোনা ছাড়া সিদ্ধান্ত দেওয়া ইসলামসম্মত নয়।
(সুরা হুজরাত: ৬)
২. গোপন ও সম্মানজনক সমঝোতার চর্চা: কারো অপমান নয়, বরং কল্যাণকামীভাবে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা সুন্নত।
৩. সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করা : রাসুল (সা.) বলেন, ‘দুই মুসলমানের মাঝে মীমাংসা করে দেওয়া সদকা করার মতো একটি কাজ।’ (বুখারি, হাদিস: ২৭০৭)
৪. সামাজিক উস্কানিদাতাদের নিরুৎসাহিত করা: গুজব, একপক্ষীয় ভিডিও, রোষানলমূলক মন্তব্য থেকে বিরত থাকা ঈমানের দাবী।
বিবাদ হলে সেখানে একজন মীমাংসাকারী হওয়া মানে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে থাকা। রাসুল বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিরোধ নিরসনে কাজ করে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাকে জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুস্তাদরাক হাকিম)
আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অনেকেমতপার্থক্যকে বিদ্বেষে রূপ দিতে উদগ্রীব। অথচ ইসলাম শিক্ষা দেয়; ‘দ্বন্দ্বে উস্কানি নয়, বরং মীমাংসায় হাত বাড়াও’।
শান্তির উদ্যোগ নেওয়াই মুসলমানের পরিচয়। দ্বন্দ্বের আগুনে ঘি নয়, বরং হৃদয়ের পানি ঢেলে দেওয়া। এটাই রাসুল (সা.)-এর সুন্নত। চলুন, সেই পথেই আমরা সবাই একসাথে চলি।
মন্তব্য করুন: